সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে গতকাল ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সদস্য রুমিন ফারহানার এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, এ সরকারের অর্থনৈতিক নীতি হলো দেশীয় ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো। আসন্ন জাতীয় বাজেট ও পরবর্তী সময়ে এর প্রতিফলন দেখা যাবে। এ সময় আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, বর্তমান ঋণের পরিসংখ্যান মূলত আগের সরকারের রেখে যাওয়া দায়ের প্রতিফলন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ৯০ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকারের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ৭৮,০৬৭ দশমিক ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ। তিনি জানান, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ সরকারের পক্ষে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করে। প্রতি অর্থবছর বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের জন্য ঋণের আসল ও সুদ বাবদ সম্ভাব্য মোট ব্যয় কত হতে পারে তার একটি প্রক্ষেপণ তৈরি করা হয় এবং সে পরিমাণ অর্থ ঋণ পরিশোধ বাবদ বাজেটে সংস্থান রাখা হয়। বাজেট বরাদ্দ ব্যবহার করেই সারা বছর পরিশোধ সূচি অনুসরণ করে ঋণ পরিশোধ করা হচ্ছে।
ব্যাংক খাতের ওপর চাপের কথা স্বীকার করে মন্ত্রী বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি ‘ক্যারি-ওভার’ সমস্যায় ভুগছে, যেখানে অনেক কারখানা মালিক শ্রমিকদের বেতন ও ঋণের কিস্তি পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন। কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কাজ চলছে। মন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমরা আগে যে পর্যায়ে ছিলাম, সেখানে ফিরে যেতে সময় লাগবে। তবে সরকার তা কার্যকরভাবে করতে পারবে।’ বিদেশে পাচার হওয়া হাজার হাজার কোটি টাকা উদ্ধারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার কূটনৈতিক ও পেশাগত উভয় মাধ্যমে কাজ করছে। পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি রিকভারি প্রতিষ্ঠানগুলোও কাজ করছে। অর্থ উদ্ধারের জন্য আমরা উপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়েছি। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি রিকভারি প্রতিষ্ঠানগুলোও কাজ করছে। আগামী দিনগুলোতে এ অর্থ সফলভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে সরকার প্রত্যাশা করছে।’
বিরোধী দলের সদস্য মো. সাইফুল আলমের আরেক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় ব্যক্তিবিশেষকে সুবিধা দেয়ার অভিযোগ নাকচ করেন। তিনি বলেন, ‘সরকার পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক অর্থনীতিতে বিশ্বাস করে না। আমাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় কোনো ব্যক্তিবিশেষের অযৌক্তিক সুবিধার সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক আইন সংশোধনগুলো আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল করতে এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পুঁজি ফেরাতে সহায়ক হবে।’
ইসলামী ব্যাংক থেকে বিদেশী বিনিয়োগ প্রত্যাহার ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের অভিযোগ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘নতুন ব্যাংকিং সংশোধনীর মাধ্যমে একটি নতুন প্রবেশদ্বার তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সব শেয়ারহোল্ডার ও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীর জন্য স্বচ্ছভাবে বিনিয়োগ বা সমন্বয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। আমরা চাই টাকা আবার ব্যাংকে জমা হোক। এ সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত। সরকার একটি প্রতিযোগিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যেখানে কোনো একক গোষ্ঠী, যেমন এস আলম গ্রুপ রাষ্ট্র বা আমানতকারীদের স্বার্থের ঊর্ধ্বে বিশেষ সুবিধা পাবে না।’
তিনি বলেন, ‘আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, অতীতে যখনই বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, তখন আর্থিক শৃঙ্খলা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কিংবা শেয়ারবাজার নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। তাই নিশ্চিন্ত থাকুন।’
সরকারি দলের সদস্য মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামের এক তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত ৩৪ হাজার ৮৭৩ দশমিক ৩২ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী এ রিজার্ভের পরিমাণ ৩০ হাজার ২০১ দশমিক ৭১ মিলিয়ন ডলার।
তিনি বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে বহাল রয়েছে। জুলাই ২০২৪-এ খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ, যা মার্চ ২০২৬-এ কমে ৮ দশমিক ২৪ শতাংশে নেমে এসেছে। বর্তমানে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, ভঙ্গুর ও সংকটে থাকা উৎপাদন ও আর্থিক কার্যক্রমকে সহায়তা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বিশেষ সহায়তামূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে ব্যবসায়ীদের মূলধনে যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, সে বিষয়েও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মপরিকল্পনা করেছে।
পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা সরকারের অগ্রাধিকার জানিয়ে আমির খসরু বলেন, ‘এ লক্ষ্যে পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন গঠন, শক্তিশালী বন্ড ও ইকুইটি মার্কেট গড়ে তোলা, ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রবাসীদের জন্য ইনভেস্টমেন্ট গেটওয়ে চালু এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।’